বারো শতকের প্রথম দিকে রংপুরে খেন বংশের অভ্যূদয় ঘটে। এ বংশের রাজা ছিলে নীলধ্বজ্ব ও নীলাম্বর। খেন বংশের শেষ রাজা ছিলেন নীলাম্বর। তার রাজধানী ছিল ‘চতরা’ নামক স্থানে। ‘চতরা’ ছিল বর্তমান রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে। এখানেই ছিল নীলাম্বরের দূর্গ। নীলাম্বর ছিলেন শক্তিশালী রাজা। ১৪১৮ খৃষ্টাব্দে গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহ আক্রমণ করেন নীলাম্বরের রাজ্য। তিস্তা নদীর পারে উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে নীলাম্বর পরাজিত হয়ে আসাম পালিয়ে যান। ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় রাজা নীলাম্বরের রাজধানী। খেন বংশের পতনের পর এ অঞ্চলে মুসলিম সুলতানদের অধিকারে চলে যায়। এর পরে যায় মোঘলদের করতলে। কিন্তু এ অঞ্চলের মানুষ বারবার বিদ্রোহ করেছে-নেমেছে লড়াইয়ে। সেজন্য মোঘল আমলের সেনাপতি মানসিংহ, মীরজুমলা, এবাদত খাঁন, আলী কুলি খান, শাহ ইসমাইল গাজী প্রমুখ সেনাবাহিনী নিয়ে ছুটে এসেছিলেন বিদ্রোহ দমন করতে। ঐতিহাসিক হায়দার আলী চৌধুরী তাঁর ‘পলাশী যুদ্ধোত্তর আযাদী সংগ্রামের পাদপীঠ’ গ্রন্থে বলেছেন- ১৭৫৭ সালে পলাশী ট্রাজেডির মাত্র তিন বৎসর যেতে না যেতেই এই উপমহাদেশে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল এই বাহের দেশে। নুরলদীন কিংবা ফকির মজনু শাহের ‘জাগো বাহে কোনটে সবায়’-এই রণ-হুংকারে মুক্তির সংগ্রামে জ্বলে উঠেছিল মানুষ। ফকির মজনু শাহ, নুরলদীন, কারেক জং, ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী, দয়াশীল, মুশা শাহ, চেরাগ আলী শাহ প্রমুখের নেতৃত্বে হয়েছে জীবনপণ সংগ্রাম। বিশ্বকোষে লেখা আছে, ‘৫০ সহস্র সন্ন্যাসী অনুচরে পরিবৃত ভবানী পাঠক খরবেগা ত্রিস্রোতার (তিস্তা) সলিল রাশি ও তার তীরভূমি আলোড়িত করিয়া ইংরেজ হৃদয়ে আতংক উপস্থিত করিয়াছিলেন’। ভবানী পাঠক ছিলেন কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার পাঠক পাড়ার অধিবাসী। এরপর যুগে যুগে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে এখানকার মানুষ। তারপর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কুড়িগ্রামের মানুষ। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ অঞ্চলের মানুষের রয়েছে অসম সাহসী গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। বহু বছরের জুলুম-নির্যাতন, আর এই বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে সংঘটিত আন্দোলন ও গণঅভ্যূত্থানের পরিণতিতে ৪০ বছর আগে ঘটে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের গৌরবান্বিত দিনগুলি আজো উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে। বারে বারে আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই ভয়াল আর গৌরব গাঁথার দিনগুলি। ১৯৭১ সালের ১০ মার্চ কুড়িগ্রামের তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ছাত্র নেতাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় মহকুমা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। এই সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে থানা ও এলাকা ভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। ১৭ মার্চ কুড়িগ্রামের সবুজ পাড়াস্থ চিলড্রেন পার্কে (বর্তমানে কুড়িগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমী কার্যালয়) বিকেলে অনুষ্ঠিত ছাত্র-জনসভায় ‘তুষার’ নামক একটি শিশু দ্বারা বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে ছাত্র নেতৃবৃন্দ সুই ফুঁটিয়ে হাতের আঙ্গুল থেকে রক্ত বের করে তা ছুঁয়ে এ দেশকে স্বাধীন করার শপথ নেন। তারপর এখানকার মানুষ সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ২৮ মার্চ গহওর পার্ক ময়দানে ( বর্তমানে আদর্শ মজিদা ডিগ্রি কলেজ) বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার শপথ নেয়। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট শহরকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য তিস্তা ব্রীজের পূর্বপাড়ে ১ এপ্রিল প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তোলা হয়। ৪ এপ্রিল পাকিস্তানপন্থী কিছু এদেশীয় দালালের সহযোগিতায় পাক বাহিনী হারাগাছ দিয়ে তিস্তা নদী পার হয়ে লালমনিরহাট দখল করে নেয়। এরপর পাক বাহিনী ৭ এপ্রিল এবং ১৪ এপ্রিল কুড়িগ্রাম শহর দখল করার চেষ্টা করে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধে সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। অবশেষে ২০ এপ্রিল পাকবাহিনী কুড়িগ্রাম শহর দখল করে। ২৫মে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ভেঙ্গে দিয়ে পাক বাহিনী ধরলা নদী পার হয়। ২৭মে নাগেশ্বরী এবং ২৮মে ভূরুঙ্গামারী দখল করে। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লেও পরবর্তীতে সংগঠিত হয়ে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ভূরুঙ্গামারী, সোনাহাট, পাটেশ্বরী, কুড়িগ্রাম, উলিপুর, চিলমারী ইত্যাদি রণাঙ্গনে পাক হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমণ জোরদার করে। কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, সদর, রাজারহাট ও উলিপুর থানার কিছু অংশ ৬নং সেক্টরের অধীনে ছিল। বাকী উলিপুর থানার কিছু অংশ চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর থানা ছিল ১১নং সেক্টরের অধীনে। অবশেষে এতদাঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা পাক বাহিনীর উপর প্রচন্ড আক্রমণ চালিয়ে ১৪ নভেম্বর ভুরুঙ্গামারী, ২৮ নভেম্বর নাগেশ্বরী এবং ৩০ নভেম্বর- এর মধ্যে সমগ্র উত্তর ধরলা মুক্ত করে। উল্লেখ্য, রৌমারী ও ফুলবাড়ী থানা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তাঞ্চল ছিল। ১ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক থেকে কুড়িগ্রাম শহর ঘিরে ফেলে এবং পাক বাহিনীর উপর আক্রমণ শুরু করে। তারপর এলো কাঙ্খিত সেই দিন- ৬ ডিসেম্বর। এদিন উলিপুর অবস্থানরত পাক বাহিনী পিছু হটে ভোরের মধ্যে কুড়িগ্রামে চলে আসে। বিকেল ৩টার দিকে পাক বাহিনী গুলি করতে করতে ট্রেন যোগে কুড়িগ্রাম শহর ত্যাগ করে রংপুরের দিকে পালিয়ে যায়। বিকেল ৪টায় কোম্পানী কমান্ডার আব্দুল হাই সরকারের নেতৃত্বে ৩৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা কুড়িগ্রাম শহরে প্রবেশ করে নতুন শহরস্থ ওভারহেড পানির ট্যাংকের উপর স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে চারদিকে বিজয় বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিল। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানকার প্রায় তিন লক্ষ মানুষ দেশত্যাগ করে ভারতীয় শরণার্থী শিবিরসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়। জেলায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার জন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৯৯ জন। এছাড়াও প্রায় ১৪ হাজার নিরীহ-নিরাপরাধ মানুষ পাক বাহিনীর হাতে নিহত হয়। ভাঙ্গা-গড়া, উত্থান-পতনের ইতিহাস সমৃদ্ধ কুড়িগ্রাম। এই জেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত অন্যতম নদী তিস্তা। যার অববাহিকায় সভ্যতার ঊষালগ্নে গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর প্রথম রেশম শিল্প। অর্থনীতি ও ইতিহাসের গবেষক অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমদ তার আমাদের প্রাচীন শিল্প গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন পাক ভারত উপমহাদেশ ও চীন দেশ রেশমের আদি বাসভূমি। উভয় দেশের পাঁচ হাজার বছর আগেরকার সাহিত্যে রেশমের উল্লেখ দেখা যায়। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে উল্লেখিত ‘ক্ষৌম ও ‘পত্রোর্ণ’ ছিল রেশমী বস্ত্র। উত্তরবঙ্গে তা উৎপন্ন হত। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে উর্ণ, কৌথেয়, কীটজ, ক্ষৌম ও পট্ট- প্রভৃতি নামের রেশমী বস্ত্রের উল্লেখ দেখা যায়। রেশমী ফার্সি শব্দ। মুসলিম আমলে এই নামকরণ হয়। চীন সম্রাট কোহি বংশীয় রাজা চীন নং ২৮০০ খৃষ্টপূর্বে রেশমী বস্ত্র উদ্ভাবন করেন বলে কিংবদন্তী আছে। কিন্তু এ উপমহাদেশের উৎপন্ন রেশম আর সি বোয়াল্লী প্রমুখ রেশম তত্ত্ববিদের মতে অন্য কোথাও থেকে আনীত নয়। বিখ্যাত পুরাতত্ত্ববিদ টেলরের মতে এ বিরাট ঐতিহ্য নিয়ে বড়াই করতে পারে যে জায়গা তা বাংলাদেশের একটি অংশ। সিরিজ জাতি পৃথিবীতে প্রথম রেশম ব্যবহার প্রচলন করে। টলেমী, পম্পেনিয়াম, মেলা, প্লাীনিং ও পওসেনিয়াস সিরিজ জাতিকে রেশম উৎপাদানের জন্য খ্যাত বলে উল্লেখ করেন। বুনো গাছের ফুল থেকে এক রকম পদার্থ পাওয়া যেত তা থেকে সিরিজ বা রেশম উৎপন্ন করা হতো বলে এরা উল্লেখ করেছেন। এরিয়ান সিরিজ দেশকে `jinae’ বলে উল্লেখ করেছিলে। সিরিজ দেশের অবস্থিতি সম্বন্ধে প্রাচীন লেখকদের মধ্যে মতদ্বৈততা ছিল। এদের ধারণা ছিল সিরিজ চীন ছাড়া অন্য কিছু নয়। টেলর প্রমাণ করে গেছেন সিরিজ’রা ছিল রংপুরের আদিম অধিবাসী (J.A.S.B. Jan. 1847)। এতদাঞ্চলে প্রবাহিত নদীর তীরে এরা রেশম বিনিময় করতো বলে পম্পেনিয়াম, এরিয়ান ও মেলা উল্লেখ করেন। প্লীনিং এতদাঞ্চলের প্রধান নদী `Psitras’ বলে উল্লেখ করেন। এ নদীটিই হচ্ছে ‘তিস্তা নদী’ (Modern Review : August 1944)। চতুর্থদশ শতাব্দীতে ভৌগলিক আগাষ্টান উল্লেখ করেন, সিরিজ বা উর্ণাজালের মত সুক্ষ্ম রেশম এক প্রকার ফুল থেকে আছড়িয়ে বের করা হতো। ৫২৭ খৃষ্টাব্দের দিকে এখানকার রেশমী পোষাক রোমান সুন্দরীদের অত্যন্ত প্রিয় ছিল। ইরানী বণিকরা এখান থেকে তা সংগ্রহ করে রোমে চালান করতো। রোমান সম্রাট আরিলিয়ান অগ্নিমূল্যের কারণে তার সম্রাজ্ঞীর রেশম বস্ত্রের আবদার পূরণে ব্যর্থ হয়ে রেশম চাষের প্রযুক্তি হস্তগত করার সিদ্ধান্ত— নেন। প্রচুর পুরস্কারের লোভে দুই ইরানী বণিক তিস্তা অববাহিকায় এসে সহজ সরল মানুষগুলোর সঙ্গে মিশে সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে ফাঁকা লাঠির ভেতর পুরে রেশম কীটের ডিম নিয়ে যায় রোমে। ৫৫২ খৃষ্টাব্দে সে ডিম থেকে কীট জন্মিয়ে তুঁত গাছের পাতা খাইয়ে রেশম উৎপাদন করা হয়। এভাবে রেশমের বৃহত্তর বাজার রোমসহ অন্যান্য এলাকার বাজারগুলো হাতছাড়া হয়ে যায়। এর ফলে বিলুপ্ত হতে থাকে এতদাঞ্চলে উৎপাদিত অগ্নিপাট, কাঞ্চাপাট, কালাপাট, পাটের বুনি, পাটের আছড়া, নেতা, নালাদ, ফেমী, তসর প্রভৃতি নামের রেশমী বস্ত্র। আজও তিস্তা পাড়ের কোনো কোনো এলাকায় দু’একজন চাষীকে রেশম সূতা তোলার কাজ করতে দেখা যায়। এ ছাড়াও তৎকালীন সময়ে এ এলাকায় মানুষের প্রধান ফসল ছিল পাট, ধান ও খয়ের। আর ছিল দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যাদির উৎপাদন। যেমন ঘোল, ঘি, মাখন ও দই। মূলতঃ রেশম ব্যবসা মার খাওয়ার পর শুরু হয় খয়ের উৎপাদন। এটিও এক সময় বন্ধ হয়ে গেলে শুরু হয় পাটের ব্যবসা। কিছু এলাকায় ছিল তামাক চাষ- বিক্রি এবং শুটকী উৎপাদন। এ অঞ্চলের তামাক যেত দূর দূরান্তে। এমনকি সুদূর বার্মাতেও। এ সকল ব্যবসা এক সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে আসলে অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী এবং দিন মজুরে পরিণত হয়। এভাবেই চলছে এখন। জেলায় শিল্প কারখানা নেই বললে চলে। একমাত্র বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিলস্ লোকসানের বোঝা গুনতে গুণতে এখন ধুঁকে ধুঁকে চলছে। বেসরকারি উদ্যোগে স্থাপিত একটি স্পিনিং মিলের অবস্থাও ভালো নয়। ফলে অধিকাংশ মানুষ এখন কৃষি এবং দিনমজুরীর উপর নির্ভরশীল।